Loading…

Blog

Our Thoughts

The greatest form of knowledge is knowing yourself. Knowing yourself starts with knowing your thoughts. Your mindset is nothing more than a compilation of your thoughts. Your thoughts have incredible power to shape your life and the lives of others, because your thoughts and interpretations of circumstances directly influence your beliefs, and ultimately, your actions.

বনফুল ও ঝড়ে পড়ার শব্দ

খেলা শুরুর আগেই হারিয়ে যাওয়াকে কাপুরুষত্ব বললেও জীবন শুরুর আগে জীবনের কাছে হেরে যাওয়াকে আমরা তা বলি না। কেন বলি না? এটা কি ঐ নাবালক শিশুটির প্রতি আংগুল তোলা যাবে না বলেই? নাকি যে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বোপরি যে আমাদের মাঝে শিশুটির জন্ম সেদিকে আংগুল নির্দেশ করবে বলেই? কিন্তু আপনি কি জানেন বা কখনো ভেবে দেখেছেন, কত শিশু কৈশোর পেরোনোর আগেই জীবনের খেলায় বাতিলের খাতায় নাম লেখিয়ে ফেলে? জানেন এদের অনেকের দুমোটো ভাত খেয়ে জীবন চালানোর নিশ্চয়তাও এই শৈশবেই মাটি হয়ে যায়, বিসিএস, কবি, সাহিত্যিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়াকে এরা ভাগ্য বলে মেনে নেয়, কুটিল সমাজ এদেরকে শিখিয়ে দেয় অলৌকিক(যেমন ঈশ্বর বা কর্মের দান) কিছু বলে; এই শিশু যাদের আমরা ফুলের মত নিস্পাপ বলি তারা শিশুকালেই তো ঈশ্বরের দেওয়া এসব জীবিকার বেদিতে উঠার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে! সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিংবা আমরা যারা মানবিক বলে দাবি করি তারা কি একটু জীবন নিয়ে খেলার সুযোগটা তাদের করে দিয়েছি! শুধু দেখুন, বাংলাদেশে যেসব আশ্রম বা গ্রামীন শিক্ষালয় আছে সেখানে ভর্তি হওয়া ৯৯ শতাংশ শিশুই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মত সম্ভাবনাকে মাটি করে সেসব প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে। তাদের সুন্দর মানুষ হওয়া সেটা সুদূর পরাহত কেননা যে জীবন হার দিয়ে শুরু এবং যে জীবনে হারের চিন্হ বয়ে বেরাতে হয়, যে জীবন দুমুটো ভাতের নিশ্চয়তা দেয়না সে জীবনে মানবিকতা হল শৌখিনতা। কিন্তু আমরা তাই করে বেরিয়েছি সারাজীবন।

২০১৪ সালে আমি একটা ছোট সমীক্ষণে করে দেখেছি আশ্রম বা মক্তবে যে সব শিশু বড় হয় তাদের সকলেই জীবনের স্বপ্নবোনা বন্ধ করেই এসবে ভর্তি হয়। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হল, প্রথম দিকে ভর্তি হওয়া এসব শিশু এসএসসি পাশ হওয়ার আগেই ৬০-৭০ শতাংশ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। কিন্তু মানবতাবাদী থেকে শুরু করে ঈশ্বরের নিচে যত টাইটেল আছে সব এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালকেরা গ্রহন করে! আমাদের সমাজে আজকে হৃদয়হীনতাই যেন মানবিকতার প্রধান মাধ্যম। আহা, কত সুন্দর ফুলই না আমরা পায়ে মাড়িয়ে মানবতার সিংহাসনে আরোহন করেছি! এই ফুলগুলোর কাছে, সমাজের কাছে যে পাপ আমরা করে যাচ্ছি তার শাস্তি কি ঈশ্বরের বা কর্মের নিক্তিতে মাপা যাবে? অবশ্য সেজন্য ঈশ্বর বা কর্মের গাতানুগতিক বইয়ে এসবের উল্লেখও নেই। তাইতো হয়তো আমরা কখনো কি দেখিনি কিংবা দেখলেই অন্তরে ধারন করিনি শিশুকালেই মা-বাবার বিচ্ছেদের বিষে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিষ্ট হলে কিংবা জন্মই যদি ওর আজন্ম পাপ হত তাহলে ওর বিশ্বনেতৃত্বে আসা হত না। আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্রের সুবিধা নিয়ে কবি সাহিত্যিক হওয়া এসব শিশুদের ক্রেডিট যদি সমাজ বা রাষ্ট্র দাবী করে, তাহলে এসব আশ্রম, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বঞ্চিত হয়ে যেসকল শিশু হেরে গেল তাদের স্বপ্ন ভেংগে ফেলার দোষটা কেন তারা নেয় না? গৌতম বুদ্ধ বলছেন, যারা চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী করছে তাদের দায়িত্ব সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এড়াতে পারে না। আমরা বৌদ্ধ হিসেবে দাবী করলে এটা অনুধাবন করা উচিৎ। ব্রিজিং-জেনারেশনস সকলের কাছে সে দাবী নিয়েই এসেছে। আসুন আমাদের সামাজিক দুঃখ নিরসনে হাত বাড়াই। এসব দুঃখ সমাজকে আড়ষ্ট করার আগেই আসুন আমরা এগুলোকে জয় করি। যে ফুলগুলোকে পিষ্ট করেই মানবতার সিংহাসনে আমারা বসছি, সে সুন্দর ফুলগুলোকে বেদিতে সাজিয়ে রেখে, কিংবা মাথায় খোপা করে সাজিয়ে রাখলে সমাজ, জাতিকে সমৃদ্ধ দেখাবে। আপনি তখনই জয়ের হাসি হাসবেন।

গৌতম বুদ্ধ দুঃখ নিপীড়িতদের দেখে মুচকি হাসতেন কারন সেসব দুঃখ তাকে অনুরিত করলেও, আড়ষ্ট করে নাই; তার দুঃখের বিনাশ এসছে এভাবেই। আমাদের সামাজিক দুঃখগুলো আমাদের আড়ষ্ট করে রেখেছে, অনুরনন তৈরী করে নাই। দুঃখমুক্তি হবে কিভাবে? দুঃখকে দেখে আলিংগন করুন, অনুধাবন করুন হাসিমুখেই আপনি দুঃখকে মোকাবেলা করতে পারবেন। যদি, ভয়ে দূরে সরে যান দুঃখ আপনাকে কখনো পিছু ছাড়বে না। আসুন, আমাদের গরীর মেধাবী সন্তানদের কোলে তুলে নিয়ে সুন্দর বেদিতে বসাই। আমাদের সমাজ সুন্দর দেখাবে, জাতি সমৃদ্ধ হবে। সামাজিক পরিবেশ পুষ্ট হবে। কেননা, বস্তিতে শীততাপনিয়ন্ত্রিত পাকা রাজপ্রাসাদ করার মহত্ততা থেকে গুলশানের ভিয়াইপি জায়গায় একটি ছোট ঘড় করার কৃতিত্বই আলাদা।

পিতার নাম বাবা নেই

২০১৯ সালের যখন থেকে ব্রিজিং জেনারেশন এর যাত্রা শুরু হয় তখন থেকে আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুঁলিতে এক বুক কষ্ট আর চোখের কোণে লোনা জলের বসবাস। 

প্রকৃতিগত কারণে অনেকে কেঁদে প্রকাশ করতে পারেবুকের অনুভূতি। কিন্তু লৈঙ্গিক  ভাবে আমরা পুরুষ। আমরা কাঁদতে পারি না। ধর্মীয়ভাবে আমরা ভিক্ষু। আমাদের কান্না আমাদের চোখেই মানায় না। কিন্তু আমরা কাঁদি। 

আমাদের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়। আমাদের কণ্ঠ জড়িয়ে আসে। আমাদের লোম শিহরিত হয়। আমাদের চোখে পানি আসে। 

আমরা অবাক হই, আশ্চর্য হই, আমরা দুঃখী হই। আমাদের অনুভূতি আমাদের ভিতরে দহন করে। আমরা গলে যাই।

২০১৯ সাল থেকে আমরা ব্রিজিং জেনারেশনের মাধ্যমে মাসিক বৃত্তি কার্যক্রমের পরিকল্পনা করি। দেড় বছর যাবত শুধু ফিল্ড এনালাইসিস করি। শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ করি। পজিটিভ, নেগেটিভ ভাবনা ভাবি। সপ্তাহে সপ্তাহে কয়েক ঘন্টা করে আলোচনা করি। দেশের নানা অঞ্চল থেকে ফরম সংগ্রহ করি। পরিবারের আত্মীয়, শিক্ষকদের সাথে কথা বলি। আর যখনই কথা বলি তখন আমাদের চোখ ভিজে যায়। আমরা প্রশ্ন করি,
-তোমার মা কোথায়? 
-ছেলে হাসতে হাসতে বলে, আমার তো মা নেই। 
আমরা তা শুনে মনে মনে কাঁদি। মা নেই এটা কি কেউ হাসতে হাসতে বলতে পারে?  কিন্তু ছেলেটা বলতে পারছে। কারণ সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মাতৃহীনতা তার বুক স্পর্শ করতে পারেনি৷ কিন্তু যেদিন স্পর্শ করবে সেদিন সে কতটা অসহায়ত্বে ভুগবে এটা ভেবে আমরা স্বস্তি বোধ করতে পারি না। 

আমাদের আহত করে অভিস্যা বড়ুয়ার জীবন। ছোট একটা মেয়ে। অথচ শরীরে ক্যান্সার। সে ভাবে জীবন যাপন করছে,বেঁচে আছে তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি?? 
পুষ্পিতা বড়ুয়া। তার বাবার স্ত্রী তার মা নয়। মার স্বামী তার বাবা নয়। প্রকৃতি কত নিষ্ঠুর এই জীবনের সাথে। 
মামুনি বড়ুয়া। কোভিডের ছয় মাসের মধ্যে  যার মা বাবা দুজনেই মারা গেছেন।
অধরা বড়ুয়া। যার বাবা লোন শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো।
তুলি ও তিথি বড়ুয়া । যার বাবা ৫বছর ধরে শয্যাশায়ী।
প্রিয়ন্তী বড়ুয়া। যে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আংকেল ( আমরা ভিক্ষু পরিচয়ে কারো সাথে কথা বলি না৷ কারণ আমরা চাই না ধর্মীয়  পরিচয় তাদের অনুভূতি  প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করুক।আমরা তাদের বুকের  দীর্ঘশ্বাসের গভীরতা শুনতে চাই)
-আগে চা খাইতে বইলি মুড়ি, বিস্কুট ন থাইলি আঁই আর আঁর ঠাকু ধরি লই আজিয়ে নাস্তা নাই। নাস্তা ন খাইয়ুম। কিন্তু  এখন নাস্তা ন থাইলি আঁই আঁর ঠাকুর মিক্কে চাই আঁর ঠাকু আঁর মিক্কে চাই। কারণ  এখন আঁরার ঘরত আঁর বাপ। ১০ বছর পর ফেরত আস্সি। কিন্তু বেকার। 
গত দশ বছরত আঁরে শুধু  একজোড়া জুতা আর এক জোড়া জামা দিইয়ি। ১০বছর পর বাবা ফেরত আসাতে সুখী হয়েও সে দুঃখী। আমরা সে দুঃখ বোঝার চেষ্টা করি। 

ঐশী বড়ুয়া। যার মা বাবা কেউ নেই। এক মাসির ঘরে থেকে মেট্রিক পাশ করলো। আরেক মাসির কাছে থেকে ইন্টার পড়ছে। আমরা তার স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করি।  সে উল্টো প্রশ্ন করে আমাদের -কি স্বপ্ন দেখবে? এটা যতটা না প্রশ্ন তার চেয়ে বেশি অভিযোগ, অসহায়ত্ব প্রকাশ।কারণ সে বড়
তার বিয়ে দিতে হবে। কোথাও হয়তো একটা পাথর সমান বোঝা লুকিয়ে আছে। আমরা পাথর গলাতে পারি না। 

এভাবে কত জনের নাম নিয়ে লিখবো?
বর্তমানে আমাদের নির্বাচিত শিক্ষার্থীর পরিমাণ ১৫৬ জন। ১৫৬ টা গল্প। সিমেনু, রাধিকা, সিংক্রেতু,পিংকি, সুইটি শতাধিক নাম শতাধিক কান্নার জীবন। কিন্তু এবার সব জীবনের গল্পকে হার মানিয়ে এক ভিন্ন জীবন উপস্থিত। 

নাম: অন্তু বড়ুয়া।
২০২৪ সালে আমাদের হাতে ৯৬ টা ফরম আসে। যার মধ্যে একটা ফরমে পিতার নামের স্থলে লেখা ছিল, বাবা নেই। বিষয়টি আমাদের কাছে দৃষ্টিকটু মনে হয়।আমরা নির্বাচক প্যানেলের সাথে আলোচনা করি এই শিক্ষার্থীর ফরম এরকম কেন?
স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া হতে পারে,তাই বলে সন্তানের বাবাকে তো অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া তিনি আমাদের ফরমে বাবা নেই লিখেছেন। কিন্তু স্কুলের ফরমে, জন্ম নিবন্ধনে বা অন্যান্য সব জায়গায় কি বাবা নেই লিখতে পারবেন? আমরা অপমানবোধ করি। এভাবে কি বৃত্তির ফরম দেয়া যায়? নির্বাচক প্যানেল পুনরায় ফোন করে কথা বলে এবং মন্তব্যের ঘরে লিখে- কোন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি। সকল মূল্যায়ন শেষে নির্বাচক প্যানেল ২৬ জনের একটি তালিকা দেয়।
 এই সময়টাতে আমি (লিডারশীপ টিমের সদস্য) ব্রিজিং জেনারেশনের নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য শ্রীলঙ্কা হতে বাংলাদেশ যাই। এবং নানা কর্মসূচীতে ব্যস্ত থাকি। বাংলাদেশ থেকে ফিরে নির্বাচক প্যানেলের তালিকা নিয়ে বসি। আর তাতে দেখি অন্তু বড়ুয়ার নাম নেই। 

আমরা পুনরায় অন্তু বড়ুয়ার তথ্য নেয়া শুরু করি। আর যে তথ্য পাই- অন্তুর মা থাকে বাবার বাড়ি। অন্তু গর্ভবস্থায় ওর মা বাবার বাড়ি আসে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে স্বামী বা কেউ আর নিতে আসে নি। বা ফেরত নিয়ে যাইনি।

এই টুকুতে যদি আমার লেখা শেষ করতে পারতাম তাহলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম। কিন্তু মনের বিরুদ্ধে   আমাকে আরো লিখতে হচ্ছে এবং জীবনের সবচেয়ে খারাপ লেখাটা।
" অন্তুর বাবা অন্তুকে সন্তান হিসেবে স্বীকার করে না। "
আমি অন্তুকে নিয়ে আর ভাবতে পারছি না। সন্তান কি এভাবে জন্ম হতে পারে?  অন্তুর বাবার নাকি আরেকটি বউ আছে। কিন্তু অন্তুর বাবা নেই। 
বাবা হওয়া সহজ নয়। কিন্তু জন্মদাতা??
 স্বীকার না করার মধ্য দিয়ে অন্তু জন্মপ্রক্রিয়ার উপর যে কালিমার প্রলেপ তা আমাদের ভয় জাগিয়ে দেয়। কেন জীবন এমন হবে? 
আমি আর লিখতে পারছি না- আমাকে ক্ষমা করুন।  সমাপ্ত। 

ঐনচ্ছিক ঘটনা- এই লেখাটা শুরু করি ১৪/৪/২০২৪ইং সকাল সাড়ে দশটায়৷ লেখাটা শুরু করার আগে আমার রুমে আমাদের তামিল সেবক তার মোবাইল চার্জ দিয়ে যায়। বাহিরের শব্দ যেন মনঃসংযোগ নষ্ট না করে তাই কানে হেডফোন দিয়ে লিখছিলাম। এর মধ্যে কখন যে সে মোবাইল নিয়ে গেছে জানি না। এবং আমাদের বড় ভান্তেকে.....  বলেছে। বড় ভান্তে ইংরেজিতে পারদর্শী একজন ভান্তেকে পাঠালো। ঐ ভান্তে আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করছে - আমি দেশে ফোন করেছি কিনা। পরিবারের সাথে কথা বলেছি কিনা। দেশের নববর্ষের খবরাখবর নিয়েছি কিনা। আর কারো সাথে কথা বলা বাকি আছে কিনা এবং সবশেষে বলল- তামিল সেবক নাকি আমাকে কাঁদতে দেখেছে।
ওনাদের ধারণা- নববর্ষ উপলক্ষে দেশকে, পরিবারকে মিস করে নাকি আমি কাঁদছি। 
ওনাদের কিভাবে বলি-আমার পরিবার ৮০০ কোটিরও বেশি মানুষ। পশু পাখিও বাদ নেই। 

১৫/৪/২০২৪